আমাদের কথা

যোগ এখন আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত। ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী মহোদয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জাতিসংঘ ২১ শে জুনকে “আন্তর্জাতিক যোগ দিবস” রূপে  স্বীকৃতি দিয়েছে। যোগের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সাধারণ মানুষের মধ্যেও যোগের মাধ্যমে স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়ে একটা  সচেতনতা এনে দিয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মানুষের অস্তিত্ব ত্রি-ভৌমিক- অর্থাৎ শরীর, মন ও আত্মা এই তিনকে নিয়ে মানুষের জীবন। তাই জীবনকে যথার্থ আনন্দময় করে গড়ে তুলতে হলে দৈহিক, মানসিক ও আত্মিক – এই তিনেরই উন্নতি একান্ত প্রয়োজন। আমাদের দৈহিক সুস্থতা ও মানসিক বিকাশ  করতে হবে আর আধ্যাত্মিক উন্নতিও ঘটাতে হবে। আবার আধ্যাত্মিক উন্নতি করতে হলে নৈতিক আচরণ বিধিও মেনে চলতে হবে। এই নৈতিকতা ব্যষ্টি তথা সামূহিক জীবনে চলার প্রারম্ভিক বিন্দু। যোগসাধনা মানুষের এই ত্রিস্তরীয় উন্নতি ঘটায়। প্রকৃতপক্ষে এটাই আনন্দমার্গ যোগের বৈশিষ্ট্য।

      যে যোগাসন নিয়ে আজকাল এত হই-চই সেই যোগাসন নিজে মানস-দৈহিক অর্থাৎ শুধু দৈহিক নয়। মন ও শরীরের সমস্ত কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রিত হয় মানব দেহের মধ্যে ক্রিয়াশীল এক অতি সূক্ষ্ম ও সুন্দর ব্যবস্থার মাধ্যমে। আবার এই কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মূল নিয়ন্ত্রণ বিন্দুর সঙ্গে আত্মিকতার ঘনিষ্ট সম্পর্ক। তাই  বিষয়টি যতখানি দৈহিক-মানসিক ও মানস-দৈহিক, তার থেকে অনেক বেশী মানস-আধ্যাত্মিক। এর একদিকে যেমন আছে গ্রন্থি-ব্যবস্থা, পেশিসমূহ, মেরুদণ্ড, দেহসন্ধি, রক্ত চলাচল প্রণালীর ওপর আসনের প্রভাব ও সেই অনুযায়ী অনুশীলন। আবার অন্যদিকে আছে প্রাণশক্তি তথা জীবনীশক্তির নিয়ন্ত্রণ, কী ভাবে দেহ-মনে সত্যিকারের বিশ্রাম হয়- এসবের অনুশীলন। এদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে অন্তর্মুখী সাধনা-ধ্যান, সম্পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণের মূল অনুশীলন। তাই যোগাভ্যাস প্রকৃতপক্ষে উপরি-উক্ত সবকিছুকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিজ্ঞানসম্মত জীবনদর্শন, একটি সন্তুলিত আদর্শ জীবনধারা।  

       আজকাল পৃথিবীর সর্বত্র স্বাস্থ্য ও রোগ নিরাময় সম্পর্কে ধারণার এক গভীর পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকেরা বুঝতে পেরেছেন যে, আমাদের অধিকাংশ রোগব্যাধি আসলে সাইকোসোমাটিক। অসুস্থতার সাথে মনের নিবিড় যোগ রয়েছে। অর্থাৎ অসুস্থতা হচ্ছে মানসিক চাপের (stress) কারণে শারীরিক ব্যাধি।

      আমাদের দৈনন্দিন জীবনধারার প্রতি মুহুর্ত্তে আমরা মানসিক চাপের (stress)  শিকার হই। মানসিক চাপ বৃদ্ধি পেলে সব সময় মানসিক অশান্তি, খিটখিটে মেজাজ, মাথাধরা প্রভৃতি দেখা দেয়। ক্রমাগত এই মানসিক চাপ থেকে গ্যাস্‌ট্রিক,  হৃদ্‌রোগ, হাঁপানি ইত্যাদি রোগেরও সৃষ্টি হয়। শুধু এই রোগগুলিই নয়, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে অধিকাংশ রোগেরই উৎস এই মানসিক চাপ। এই মানসিক চাপ থেকেই সাময়িক ভাবে রেহাই পেতে মানুষ সাধারণতঃ ধূমপান, মদ, হিরোইন, ইয়াবা ইত্যাদি মারাত্মক নেশার দিকে ঝোঁকে। আর এর ফলে মানুষ ক্যানসার প্রভৃতি জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধির কবলে পড়ে।

       এই মানসিক চাপ থেকে মুক্তিরও একমাত্র উপায় হ’ল নিয়মিত যোগ অভ্যাস। বিশ্বের খ্যাতনামা চিকিৎসাবিদরাও এই মত পোষণ করেন।

        “আনন্দমার্গ যোগ” সাধনাবিজ্ঞানের প্রবক্তা বিংশ শতাব্দীর মহান  দার্শনিক,  যোগেশ্বর শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজী ছিলেন একজন পরম শ্রদ্ধেয় ধর্মগুরু ও বিশ্ব পরিব্যাপ্ত প্রতিষ্ঠান আনন্দমার্গ প্রচারক সংঘের প্রবক্তা ও প্রবর্তক।  এছাড়াও তিনি ছিলেন একজন বিশ্ববন্দিত কালজয়ী সঙ্গীতগুরু, প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদ, সুসাহিত্যিক, অভিজ্ঞ ভাষাবিদ্‌, বিশিষ্ট ইতিহাসবেত্তা, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ্‌ ও নব্যমানবতাবাদের মহান উদ্‌গাতা।

      তিনি তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও সাধনাবিজ্ঞান বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর দুই শতাধিক গ্রন্থে- যোগ, ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, চর্যাচর্য, নব্যমানবতাবাদ, প্রাউট ইত্যাদি বিভিন্ন পর্যায়ের রচনায়। তাঁরই প্রতিষ্ঠিত আনন্দমার্গ প্রচারক সংঘ আজ দ্রুতগতিতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর শিক্ষা, দর্শন, আদর্শ ও সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কর্মযজ্ঞের ধারাপ্রবাহ।

      আনন্দমার্গ দর্শনে শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজীর চিন্তার ব্যাপকতা, জ্ঞানের গভীরতা আর মানবতার প্রতি এত দরদ প্রকাশ পেয়েছে যা সভ্যতার ইতিহাসে অতুলনীয়। তাই আনন্দমার্গ দর্শনকে আরও ভালভাবে জানার উদ্দেশ্যে তাঁর মৌলিক রচনাগুলো বিশেষভাবে অধ্যয়ন করার জন্যে সকলকে অনুরোধ করছি। 

আনন্দমার্গ যোগ একাডেমী

আচার্য ব্রজেশ্বরানন্দ অবধূত

ডুমুরিয়া, বাকাল, আগৈলঝাড়া,

বরিশাল, বাংলাদেশ।