যোগেশ্বর শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজী

বিংশ শতাব্দীর মহান দার্শনিক, যোগেশ্বর শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজী ছিলেন একজন পরম শ্রদ্ধেয় ধর্মগুরু ও বিশ্ব পরিব্যাপ্ত প্রতিষ্ঠান আনন্দমার্গ প্রচারক সংঘের প্রবক্তা ও প্রবর্তক।  এছাড়াও তিনি ছিলেন একজন বিশ্ববন্দিত কালজয়ী সঙ্গীতগুরু, প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদ, সুসাহিত্যিক, অভিজ্ঞ ভাষাবিদ্‌, বিশিষ্ট ইতিহাসবেত্তা, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ্‌ ও নব্যমানবতাবাদের মহান উদ্‌গাতা।

       তিনি তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও সাধনা বিজ্ঞান বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর দুই শতাধিক গ্রন্থে- ধর্ম, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, ভাষাবিজ্ঞান, প্রাউট, নব্যমানবতাবাদ, চর্যাচর্য, প্রভাতসঙ্গীত ইত্যাদি বিভিন্ন পর্যায়ের রচনায়। তাঁরই প্রতিষ্ঠিত আনন্দমার্গ প্রচারক সংঘ আজ দ্রুতগতিতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর শিক্ষা, দর্শন, আদর্শ ও সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কর্মযজ্ঞের ধারাপ্রবাহ।

       শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজীর লৌকিক নাম শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার। তাঁর পৈতৃক বাসভূমি ছিল বর্ধমান জেলার ব্রাহ্মণ পাড়া (বামুন পাড়া) গ্রামে। তাঁর পিতার নাম লক্ষ্মীনারায়ণ সরকার ও মায়ের নাম আভারানী। কর্মসূত্রে লক্ষ্মীনারায়ণ সরকার থাকতেন বিহারের মুঙ্গের জেলার জামালপুর শহরে। কাজ করতেন রেলওয়ে বিভাগের একাউণ্টেণ্ট হিসেবে। এই জামালপুর শহরেই ১৯২১ সালের ২১শে মে সকাল ৬টা ৭ মিনিটে বৈশাখী পূর্ণিমার পুণ্যতিথিতে প্রভাতরঞ্জনের শুভজন্ম হয়। জন্মের পর দেবশিশুর নাম রাখা হয় অরুণ, পরবর্ত্তীকালে অরুণের নাম রাখা হয় প্রভাতরঞ্জন। আরও পরবর্ত্তীকালে পরিণত বয়সে এই প্রভাতরঞ্জন সরকারই সমগ্র বিশ্বে ধর্মগুরু হিসেবে শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজী নামে খ্যাত হন। 

      শ্রীপ্রভাতরঞ্জন তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করেন জামালপুরের কেশবপুর লোয়ার প্রাইমারী স্কুলে। ১৯৩০ সালে তিনি ভর্তি হন ইষ্ট ইণ্ডিয়া রেলওয়ে হাইস্কুলে। হাইস্কুলের পাঠ শেষ করে উচ্চ শিক্ষার জন্যে তিনি কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে ইণ্টারমিডিয়েট পাশ করে তিনি আবার জামালপুরে ফিরে যান ও কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।

       জন্মলগ্ন থেকেই বিভিন্ন ঘটনাবলীর মাধ্যমে শ্রীপ্রভাতরঞ্জনের নানান ঐশ্বরীয় বিভূতির লক্ষ্য করা যায়। পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনদের কথায় ও লেখায় আমরা তাঁর এই সব অলৌকিক ঘটনার কথা জানতে পারি। শ্রীপ্রভাতরঞ্জন কাজ করতেন জামালপুরের রেলওয়ে বিভাগে, একাউণ্টেণ্ট হিসাবে। কর্মজীবনের পরিভূতে যে সব লোকেরা তাঁর পবিত্র সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছেন তাঁদের কাছ থেকেও আমরা অনেক ঐশী ঘটনাবলীর প্রমাণ পেয়ে থাকি।

      শৈশব থেকেই শ্রীপ্রভাতরঞ্জন মানুষের দুঃখ মোচনের স্বপ্ন দেখতেন- ত্রিতাপদগ্ধ জ্বালা থেকে মুক্তির পথ দেখাবার কথা ভাবতেন। ভাবতেন এক সর্বাত্মক শোষণমুক্ত অধ্যাত্মভিত্তিক সুন্দর সমাজ গড়ার কথা। অন্যান্য যুগাবতারের মত শ্রীপ্রভাতরঞ্জনেরও কোন গুরু ছিলেন না। তিনি ছিলেন জন্মগুরু। ১৯৩৯ সালের শ্রাবণী পূর্ণিমায় কলকাতার গঙ্গা তীরবর্ত্তী কাশীমিত্র ঘাটে তিনি কালীচরণ বন্দোপাধ্যায়  নামে এক কুখ্যাত ডাকাতকে প্রথম দীক্ষা দিয়ে আধ্যাত্মজীবনের পথে নিয়ে আসেন। এরপর একে একে অনেককে তিনি দীক্ষা দিয়েছেন।

     শ্রীপ্রভাতরঞ্জন তখন কর্মসূত্রে জামালপুরে। জামালপুরের অনেক বিশিষ্ট্য লোক ও তার সতীর্থদের অনেকেই দীক্ষা নিয়েছেন। তাঁর ধর্মীয় দর্শনের ব্যাখ্যায় সকলেই অভিভূত হয়ে পড়েছেন। তাঁর জাতপাতহীন, কুসংস্কাররহিত বৈজ্ঞানিক সাধনা পদ্ধতিতে অনেকেই আকৃষ্ট হয়েছেন। তখন একার পক্ষে অনেকের ডাকে সাড়া দেওয়া তাঁর পক্ষে আর সম্ভব ছিল না। তাই জগতের ব্যাপক কল্যাণের কথা চিন্তা করে তিনি ১৯৫৫ সালে জামালপুরেই প্রতিষ্ঠা করলেন আনন্দমার্গ প্রচারক সংঘ। জামালপুরে প্রতিষ্ঠিত সেই সংঘেরই বিন্যাস, বিস্তৃতি ও বিপুল কর্মযজ্ঞ আজ সারা বিশ্বজুড়ে। পরবর্ত্তীকালে কর্মজীবন ছেড়ে সংঘের কাজেই তিনি পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন। শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে আধ্যাত্মিক ভূমিতে। শিব সাধনা বিজ্ঞান প্রবর্তন করলেন। শ্রীকৃষ্ণ সেই সাধনা বিজ্ঞানকে আরও পল্লবিত করলেন- কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ, অভ্যাসযোগ ও ভক্তিযোগের মাধ্যমে। শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজী  এই সাধনা বিজ্ঞানকে আজকের যুগোপযোগী করে প্রবর্তন করলেন অষ্টাঙ্গিক রাজাধিরাজ যোগ বা তান্ত্রিক যোগ। তিনি একে গভীরভাবে সুবিন্যস্ত ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম করে ছয়টি স্তরে তাকে সাজালেন। এই ছয়টি স্তর হ’ল- ১) নাম মন্ত্র,  ২) প্রারম্ভিক যোগ, ৩) সাধারণ যোগ, ৪) সহজযোগ, ৫) বিশেষ যোগ ও ৬) তান্ত্রিক শ্মশান সাধনা।

নিরক্ষর মানুষ থেকে উচ্চ শিক্ষার ব্রহ্ম সাধক সবার প্রয়োজন মেটাতেই তিনি সাধনার এই স্তর বিন্যাস করে দিলেন। সাধনা জগতে চরিতার্থতা অর্জনের জন্য তিনি কর্ম, জ্ঞান ও যোগ অভ্যাসের সঙ্গে সঙ্গে মোহন বিজ্ঞান তথা ‘বাবানাম কেবলম্‌’ মহামন্ত্র কীর্তনের মাধ্যমে ভক্তি জাগিয়ে তুলবার প্রয়াসকে সবচেয়ে বেশী প্রাধান্য দিলেন। কর্ম-জ্ঞান-যোগ-ভক্তির মণিকাঞ্চনযোগ ঘটিয়ে আত্মিক মুক্তির পথ নির্দেশনা দিলেন। জ্ঞান, কর্ম, অভ্যাস যোগের দ্বারা বহির্মুখী মন অন্তর্মুখী হবে, জড়মুখী মন হরিমুখী হবে, হৃদয়ে জেগে উঠবে পরাভক্তি।

      শ্রীপ্রভাতরঞ্জন ছিলেন চরম আশাবাদী। আজকের এই অবক্ষয়িত সমাজের আমূল পরিবর্ত্তনের ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবীদের যে একটা বিরাট ভূমিকা রয়েছে তা তিনি স্বীকার করতেন। বুদ্ধিজীবীদের সংঘটিত করে তাঁর বিশ্বমৈত্রীর বাণী ছড়িয়ে দেবার জন্যে তিনি তৈরী করলেন রেঁনেশা ইয়ূনিবার্স্যাল ক্লাব ও  রেঁনেশা আর্টিষ্টস এণ্ড রাইটার্স এসোসিয়েশন (R U & RAWA) নামে  দু’টি সংগঠন।

      আর্ত্তের দুর্দশায় চিরদিনই প্রাণ কাঁদত তাঁর। খরা, বন্যা, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষদের কথা চিন্তা করে তিনি ব্যথিত হয়ে পড়তেন। এই সব নিপীড়িত মানুষদের ত্রাণের জন্যে তিনি তৈরী করলেন আনন্দমার্গ ইয়ূনিবার্স্যাল রিলিফ টীম (AMURT)। সংস্থাটির কাজে খুশী হয়ে UNO এটিকে এখন স্বীকৃতি দিয়েছে।

       শ্রীপ্রভাতরঞ্জন বলতেন, খালিপেটে ধর্ম হয় না। ধর্ম সাধনার আগে শরীর সাধনাও অত্যন্ত দরকার। অথচ উপযুক্ত অর্থনৈতিক দর্শনের অভাবে সারা বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই আজ শোষিত ও নির্যাতিত। এইসব বুভুক্ষু মানুষদের কথা চিন্তা করে তিনি দিলেন যুগান্তকারী নতুন অর্থনৈতিক দর্শন –প্রাউট

      বিশ্ব পরিবেশ নিয়ে আজ সকলেই চিন্তিত। একথাও তিনি অনেক আগেই ভেবেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন বৃক্ষ-লতা-পশু-পাখী সকলেরই এই পৃথিবীতে বাঁচার অধিকার রয়েছে- সকলেরই অস্তিত্বগত মূল্য রয়েছে। তাই ব্যষ্টি জীবনে যেমন তিনি পশু-পক্ষী-তরু-লতার যত্ন নিতেন, তেমনি চরাচরের সকলের কথা ভেবে তিনি দিলেন নতুন দর্শন নব্য মানবতাবাদ- তৈরী করলেন নোতুন  প্রকোষ্ঠ ‘পিক্যাপ’ (Prevention of cruelty of Animals and Plants)।

      শ্রীপ্রভাতরঞ্জন বলতেন এই সমাজে নারী ও পুরুষ দুজনেই সমমর্যাদাসম্পন্ন। একজনের প্রগতি অন্যজনের প্রগতিকে ত্বরান্বিত করবে। নারীকে স্বীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত করে তাদের শিক্ষা-দীক্ষা-সংস্কৃতি-অর্থনীতিতে স্বয়ং-সম্পূর্ণ করে গড়ে তোলার জন্যে তিনি সর্বদা সচেষ্ট থাকতেন। এরই জন্যে তৈরী করলেন ‘নারী কল্যাণ বিভাগ’।

     শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। প্রকৃত শিক্ষা ছাড়া আদর্শ সমাজ সংরচনা করা যায় না। মানব সমাজের ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো জ্বেলে দেবার জন্যে তিনি তৈরী করলেন ‘এডুকেশন রিলিফ এণ্ড ওয়েলফেয়ার সেক্সন’ (ERAWS)।

     আজ সাংস্কৃতিক জগতে নেমে এসেছে এক চরম অবক্ষয়। আধুনিকতার নামে ডিস্কো, পপ আর ক্যাবারে মার্কা নাচ গানের প্রভাবে যুব সমাজ বিভ্রান্ত, বিকৃত রুচি সম্পন্ন, নৈতিক শক্তিহীন। এই সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের যুগে নবচেতনার বিপ্লব ঘটাতে না পারলে মানব সমাজকে বাঁচানো যাবে না। তাই তিনি নিজে তাঁর হাজারো কর্তব্য কর্মকে বিন্দুমাত্র উপেক্ষা না করেও মাত্র আট বছর সময়ে নানান্‌ ভাব-ভাষা-সুর-ছন্দে সুসমৃদ্ধ ৫০১৮টি প্রভাত সঙ্গীত রচনা করলেন। এইভাবে সমাজের সর্বস্তরের সর্বাঙ্গীন কল্যাণের কথা চিন্তা করে তিনি নানান্‌ শাখা-প্রশাখায় সমৃদ্ধ করে তোলেন আনন্দমার্গকে।

     এইভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিক্ষা-ধর্ম-রাজনীতি-অর্থনীতি সমাজের সর্বস্তরে বোধিদীপ্ত প্রজ্ঞার সুস্পষ্ট ছাপ রেখে দিয়ে ১৯৯০ সালের ২১শে অক্টোবর শ্রীপ্রভাতরঞ্জন তাঁর ইহলীলা সংবরণ করেন।