ঈশ্বরকেন্দ্রিক দর্শনের শ্রেষ্ঠত্ব -শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার

  • Post Author:
  • Post Category:Blog

ঈশ্বরকেন্দ্রিক দর্শনের শ্রেষ্ঠত্ব

-শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার

মানুষ যে সমস্ত দর্শনকে মেনে চলে তাদের চার শ্রেণীতে ভাগ করা যায়-

১। ডগমা বা ভাবজড়তা কেন্দ্রিক দর্শন (Dogma-centered philosophy)

২। জড়কেন্দ্রিক দর্শন (Matter-Centered philosophy)

৩। আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক দর্শন (Self- Centered philosophy)

৪। ঈশ্বরকেন্দ্রিক দর্শন (God- Centered philosophy )

ভাবজড়তা কেন্দ্রিক ধ্বজাধারীরা কুসংস্কার,  ত্রুটিপূর্ণ ভাবাবেগ আর উদ্ভট তত্ত্বে বিশ্বাসী। বস্তুতপক্ষে সমস্ত ধর্মমতই (Religion) ভাব জড়তা কেন্দ্রিক। তাই কোন ধর্মমতই অন্য কোন ধর্মমতকে সহ্য করতে পারে না। এরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির হীন উদ্দেশ্যে ঈশ্বরের প্রত্যাদেশের নামে সাধারণ মানুষকে শোষণ করে। ডগমার অনুসরণকারীরা বলে থাকে যে ঈশ্বর স্বয়ং স্বপ্নে আবির্ভূত হয়ে নির্দিষ্ট কাজটি করতে তাদের আদেশ দিয়েছেন, আর এই অজুহাতে সাধারণ মানুষকে চুটিয়ে শোষণ করে।

জড়বাদকেন্দ্রিক দর্শনের অনুসারীগণ নিজেদের স্বার্থে সব কিছু ভোগ করতে চায়।  জড়-জাগতিক বস্তু সমূহের ভোগই এদের প্রধান উপজীব্য। মার্কসবাদ তারই উদাহরণ। নিজেদের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্যে  এই দর্শনের মতাবলম্বীরা সাধারণতঃ পশুশক্তি প্রয়োগ করে অন্যকে শোষণ করে থাকে।

আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক দর্শনের মতাবলম্বীরা কেবল নিজেদের স্বার্থ ও আত্মসুখ চরিতার্থ করতেই সব কিছু করে থাকে। অন্য দু’টো দর্শনের থেকে এই দর্শনের মানসিক ব্যাসার্ধ একটু বড়। এই বড় ব্যাসার্ধ বলতে শুধু এইটুকু বোঝায় যে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কেবল নিজের কথাই ভেবে চলা। নিজের স্বার্থ পরিপূর্ত্তিই এখানে একমাত্র উদ্দেশ্য। উদাহরণঃ পুঁজিবাদ।

ভাবজড়তা কেন্দ্রিক দর্শন হচ্ছে ব্যষ্টিস্বার্থকেন্দ্রিক ও জড়বাদকেন্দ্রিক দর্শনের মিশ্রণ সংজাত। এই ধরনের মিশ্রণ কখনো  আদর্শ আচরণীয় (cult) হতে পারে না। আদর্শ আচরণের সঙ্গে বাস্তব জীবনাচরণের সম্পর্ক থাকতে বাধ্য। বাস্তবিকতার  সঙ্গে সম্পর্কহীন কোন কিছুই আদর্শ আচরণ (cult)  পদবাচ্য নয়।

ঈশ্বরকেন্দ্রিক দর্শনের অনুসারীগণ সমান স্নেহ-মমতার সঙ্গে  শুধু সমগ্র মানব সমাজকেই নয়, সমগ্র জীবজগৎকে নব্যমানবতাবাদী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সেবা করে চলে। যদিও এই ঈশ্বরকেন্দ্রিক মানুষদের ভাবনায় ব্যাসার্ধের তারতম্য থাকে, তবুও তাদের ভাবনার কেন্দ্রে থাকেন ঈশ্বর। ঈশ্বরই ঈশ্বরকেন্দ্রিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। তাই ঈশ্বরের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালবাসা তথা ভক্তির প্রাবল্য অনুযায়ী ব্যাসার্ধও পরিবর্ত্তিত হতে থাকবে।

এই চার ধরনের দর্শনের মধ্যে ভাবজড়তাকেন্দ্রিক দর্শনই নিকৃষ্টতম। তার থেকে একটু ভাল জড়বাদকেন্দ্রিক দর্শন। আর একটু ভাল ব্যষ্টিস্বার্থকেন্দ্রিক দর্শন। মানব সমাজের রক্ত-স্নাত অধ্যায়ের প্রধান প্রধান ঘটনা সমূহের জন্যে দায়ী ভাবজড়তা কেন্দ্রিক দর্শন।  এ ব্যাপারে জড়বাদকেন্দ্রিক দর্শন ও ব্যষ্টিস্বার্থকেন্দ্রিক দর্শনের ভূমিকাও নগন্য নয়। একমাত্র ঈশ্বরকেন্দ্রিক দর্শনের ক্ষেত্রেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সম্ভাবনা নেই। এই দর্শনে মানব মনে অভ্যন্তরীণ প্রশান্তি ও সন্তুষ্টির বাহ্যিক প্রতিফলনের ফলেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সৃষ্টি হয় না।

সাধারণ মানুষের মানসিকতা স্বাভাবিকভাবেই ব্যষ্টিস্বার্থকেন্দ্রিক। কিন্তু মানব সেবায় নিয়োজিত সর্বত্যাগীদের মানসিকতা ঈশ্বরকেন্দ্রিক। ঈশ্বরকেন্দ্রিক মানুষদের অবদানেই মানব সমাজ সমৃদ্ধ হয়েছে। অতীতে তাঁরা এই সমৃদ্ধি এনেছেন, বর্তমানে আনছেন, আর ভবিষ্যতেও আনতে থাকবেন।

ঈশ্বরকেন্দ্রিক বিশ্বের পরিধি, পথ ও অধিক্ষেত্র বাকী তিনটি থেকে অনেক, অনেক বিস্তৃততর। এই তিন ধরনের দর্শনের মধ্যে যদি কখনো সংঘর্ষ হয়, শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরকেন্দ্রিক দর্শনই জয়যুক্ত হবে। তেমনি আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক আর জড়কেন্দ্রিক দর্শনের মধ্যে সংঘর্ষ হলে আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক দর্শনই জয়যুক্ত হবে [ অর্থাৎ তা জড়কেন্দ্রিক দর্শনকে আত্মসাৎ করে নেবে ]। জড়কেন্দ্রিক দর্শন কখনই জয়ী হতে পারবে না। এই দর্শন যেমন ভাবে হঠাৎ আসে, তেমনি প্রচণ্ড ক্ষতি ও বিপর্যয় সৃষ্টি করে দিয়ে হঠাৎ একদিন চলে যায়, কালের করাল গহ্বরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

কম্যুনিজম:

ভাবজড়তা কেন্দ্রিক  ও জড়বাদকেন্দ্রিক দর্শনের বিষময় সংমিশ্রণে, এই দুই প্রকার দর্শনের পাশবিক মেলবন্ধনে কম্যুনিজমের সৃষ্টি হয়েছে। এ এক বিভৎসতম দানবীয় দাপট- যা তামসী পরিসমাপ্তির দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। বিংশ শতাব্দী শেষ হওয়ার আগেই এর অপমৃত্যু ঘটবে।

বস্তুতঃ কম্যুনিজমের কোন যৌক্তিক ভিত্তি নেই। এতে রয়েছে স্থূল জাগতিকতা, কিছুটা ভাবাবেগ আর সামান্য যুক্তি। অল্পসংখ্যক কিছু যুক্তিসম্পন্ন মানুষ এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু এটি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ দর্শন।

কম্যুনিজম তত্ত্ব ন্যায়নীতি বর্জিত, অবৈজ্ঞানিক ও অমনস্তাত্ত্বিক। কম্যুনিজমের অবলুপ্তির বিভিন্ন কারণের মধ্যে প্রত্যক্ষ কারণ ( immediate cause ) কী?

একজন মদ্যপায়ীর উদাহরণ নেওয়া যাক্‌। একজন মানুষ যদি অধিকমাত্রায় মদ্যপান করে সে যকৃতের রোগে আক্রান্ত হবে  ও পরিণামে তার মৃত্যু হবে। কিন্তু যদি সে একই দিনে অত্যধিক পরিমাণে মদ্যপান করে, ধরা যাক্‌, দশ বোতল মদ্যপান করে, তবে তার তৎক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটবে। কম্যুনিজমের আজ থেকে আরও কিছু দশক পরে মৃত্যু হতে পারত, কিন্তু বিংশ শতাব্দীর এই শেষ দশকেই তার অন্তিম দিন ঘনিয়ে আসছে। রাবন সীতাহরণ করে সবচেয়ে বড় ভুল করেছিল। কম্যুনিজমের সবচেয়ে বড় ভুল হল তা এক ঈশ্বরকেন্দ্রিক দর্শনের ওপর আঘাত হানল। এটাই কম্যুনজমের মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ।

কম্যুনিজম মানব সমাজে এক ঋণাত্মক ছাপ রেখে গেছে ও তা কখনও শান্তির পথ অনুসরণ করে নি। জড়কেন্দ্রিক তত্ত্বের বিকাশ চার্বাক দর্শনের চেয়ে কম্যুনিজমের মাধ্যমেই বেশী হয়েছে। চার্বাক ঈশ্বর সম্পর্কে কোনো ভ্রান্ত ব্যাখ্যা দেন নি, কিন্তু কম্যুনিজম দিয়েছে। এক সময় কম্যুনিজম কিছু স্থানে প্রভাব বিস্তার করেছিল। কিন্তু এখন এক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। কম্যুনিজমের মৃত্যুতে এখন বিশ্বজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক আদর্শগত শূন্যতা- ভৌতিক, মানসিক ও বৌদ্ধিক সকল ক্ষেত্রেই। অত্যল্পকালের মধ্যে এই শূন্যতা পূরণ করতে হবে এক বলিষ্ঠ নির্দেশনা ও পরিচালনা শক্তির সহায়তায়। তোমাদের উচিত বৌদ্ধিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির সাহায্যে এই শূন্যস্থান পূরণ করা। যদি অলস ভাবে বসে থাক, অন্য কোন অধ্যাত্মবিরোধী তথা দানবীয় তত্ত্ব সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে ও এই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে। তাই অলসতা ও দীর্ঘসূত্রতাকে প্রশ্রয় দিও না। যদি নিজের জীবনকে চরিতার্থ করতে ও সমাজের স্বার্থে কিছু করতে চাও, তাহলে নিদ্রা, তন্দ্রা, ভয়, ক্রোধ, অলসতা ও দীর্ঘসূত্রতা- এই ছয় প্রকার দোষ থেকে মুক্ত হতে হবে।

প্রাউটই সমস্ত সামাজিক, অর্থনৈতিক সমস্যার একমাত্র সমাধান। যদি প্রাউটের ঈশ্বরকেন্দ্রিক দর্শন আজকের এই আদর্শগত শূন্যতা পূরণে এগিয়ে না আসে, তবে অন্য কোন অবাঞ্ছনীয় দর্শন এসে যাবে। কারণ প্রকৃতির জগতে কোথাও শূন্যতা থাকতে পারে না।যদি এই আদর্শগত শূন্যতা প্রাউটের দ্বারা পূর্ণ না হয়, ভবিষ্যতে এক ভয়ংকর বিপর্যয় নেমে আসবে। অন্য কোনো ত্রুটিপূর্ণ দর্শন, কোনো ভাবজড়তাকেন্দ্রিক, জড়কেন্দ্রিক বা আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক তত্ত্ব এই শূন্যস্থান দখল করবে। আমরা এটা হতে দিতে পারি না।

ব্যষ্টিস্বার্থকেন্দ্রিক দর্শন মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে, সমগ্র মানব সমাজকে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলে। জড়বাদকেন্দ্রিক দর্শনও বৈষম্যের মাধ্যমে বিশ্বের শান্তি বিনষ্ট করে। ব্যষ্টিস্বার্থকেন্দ্রিক দর্শন অর্থাৎ পুঁজিবাদ আর জড়বাদকেন্দ্রিক দর্শন অর্থাৎ মার্কস্‌বাদ- দু’টোই অনেক দিন পাশাপাশি চলছে। পুঁজিবাদ মানুষের উপকারে লাগবে না, আর মার্কস্‌বাদ মানুষের উপকার করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই দু’টোরই মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। পুঁজিবাদের হবে স্বাভাবিক মৃত্যু, আর মার্কস্‌বাদের  অপমৃত্যু তো হয়েই গেছে।

রিলিজিয়ন বা উপধর্ম বা ধর্মমত:

রিলিজিয়ন কী? রিলিজিয়নের ভিত্তি ডগ্‌মা বা ভাবজড়তা কেন্দ্রিক দর্শন। ভাবজড়তা কেন্দ্রিক দর্শন হ’ল জড়কেন্দ্রিক ও আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক দর্শনের একটা মিশ্ররূপ। তাই রিলিজিয়নগুলি আংশিক ভাবে জড়কেন্দ্রিক ও আংশিক ভাবে আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক। জড়কেন্দ্রিক দর্শনগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরোপুরি ডগ্‌মা আশ্রিত। অন্যদিকে আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক দর্শনগুলি ডগ্‌মা ও সেন্টিমেন্টের মিশ্রণ।

রিলিজিয়নগুলি কখনো কখনো দীর্ঘকাল টিকে থাকে যদিও তারা ভাবজড়তায় পরিপূর্ণ। তার কারণ তারা জানে কীভাবে সত্যকে অস্বীকার করে বা তাকে বিকৃত করে, জনমনে কুশিক্ষার বিষ ঢুকিয়ে দিতে হয়। তারা এও জানে কেমন করে বিভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হ’ল বিশেষ সুবিধা-ভোগী শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে চলা। কিছু কিছু রিলিজিয়ন ঈশ্বরমূলক ভাবধারার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে তাদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে যদিও তারা প্রকৃত পক্ষে ঈশ্বর কেন্দ্রিক নয়। তাদের  উপধর্মগত শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হ’ল ঈশ্বর সম্বন্ধে নানান ভাবজড়তাশ্রয়ী প্রসঙ্গের অবতারণা করে সাধারণ মানুষের মনে ভাবাবেগ জাগিয়ে দেওয়া। এই ভাবাবেগগুলি মানুষের মনের গভীরে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে যায়। ভাবজড়তা কেন্দ্রিক দর্শনগুলির প্রধান প্রধান অস্ত্র হ’ল-

১। বিভিন্ন গল্পকথা, অবাস্তব কাহিনী, রূপক কাহিনী ইত্যাদি প্রচারের মাধ্যমে মানুষের মনে মহামন্যতা বোধ ( superiority complex ) সৃষ্টি করা।

২। বিভিন্ন গল্পকথা, অবাস্তব কাহিনী, রূপক কাহিনী ইত্যাদি প্রচারের মাধ্যমে মানুষের মনে হীনন্মন্যতা বোধ ( inferiority complex ) সৃষ্টি করা।

৩। জনসাধারণের মধ্যে, বিশেষ করে সামাজিক-অর্থনৈতিক সচেতনতার অভাব আছে এমন ধরনের মানুষের মনে ভীতন্মন্যতা ( fear complex ) ও হীনন্মন্যতা বোধ ( inferiority complex ) সৃষ্টি করা।

এই ভাবে সমস্ত রিলিজিয়নগুলি জনসাধারণের মনে সুকৌশলে মহামন্যতা, হীনমন্যতা ও ভীতমন্যতার সূচিকাভরণ (injection) করে দেয়। এটাই সত্য নয় কি? যেহেতু  সমস্ত রিলিজিয়ন যুক্তির পথ বর্জন করে ভাবজড়তাকে আঁকড়ে ধরে থাকে, সেজন্যেই তারা তাদের মতবাদের প্রচারে এইসব গল্পকথা ও অবাস্তব কাহিনীর আশ্রয় নেয়।

বিভিন্ন রিলিজিয়ন প্রচার করে ‘আমার ভগবানই একমাত্র সত্য, অন্যান্য ভগবানেরা মিথ্যা’। কোনো রিলিজিয়ন যখন দাবী করে, ‘আমার ভগবানই একমাত্র সত্য’- তখন বুঝে নিতে হবে, এ ধরণের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভাবজড়তাশ্রয়ী।

আমাদের দেশের পৌরাণিক কাহিনীতে আছে- পরমপুরুষের মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, দেহ থেকে বৈশ্য ও পা থেকে শূদ্রের জন্ম হয়েছে।

ব্রাহ্মনোহস্য মুখমাসীৎ বাহুরাজন্যেহভবৎ।

মধ্যতদস্য যদ্বৈশ্যঃ পদ্ভ্যাং শূদ্র অজায়ত।।

অনেকে বলেন যে এই শ্লোকটি প্রকৃতপক্ষে ঋগ্বেদের শ্লোক নয়। এ ধরণের শিক্ষা সাধারণ মানুষের মনে হীনমন্যতা ও ভীতমন্যতা বোধ সৃষ্টি করবেই। বিভিন্ন রিলিজিয়নে এ ধরনের ভাবজড়তার অসংখ্য উদাহরণ আছে।

ভাবজড়তা কেন্দ্রিক দর্শনগুলির অশুভ প্রভাব থেকে অব্যাহতি পেতে শিক্ষার প্রসার ও যুক্তিসন্মত চিন্তাধারার প্রোৎসাহন- এই দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে। কেবল স্কুল-কলেজ নির্ভর শিক্ষায় যথাযথ ফললাভের সম্ভাবনা খুবই কম। যে শিক্ষা মানব মনে যুক্তিসংগত চিন্তাধারার উন্নত স্তরের অভিস্ফূরণ ঘটাতে সক্ষম সেই শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। জনসাধারণের মধ্যে এই ধরনের শিক্ষা যাতে প্রসার লাভ করে তার ব্যবস্থা করতে হবে।

আবার বলি, রিলিজিয়ন সংক্রান্ত ডগ্‌মাকে প্রতিহত করতে আমাদের দু’ভাবে এগোতে হবে। প্রথমে যুক্তিবিজ্ঞানের পথ ধরতে হবে। এজন্যে আমাদের রয়েছে প্রাউট ও নব্যমানবতাবাদ। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনে আধ্যাত্মিক সেন্টিমেন্ট জাগ্রত করতে হবে যা রিলিজিয়াস সেন্টিমেন্টের চেয়ে অনেক বেশী শক্তিশালী। তার জন্যে জনসাধারণকে যথার্থ আধ্যাত্মিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে।

আমাদের কর্তব্য:

তাহলে উপযুক্ত কর্তব্য কী হবে? প্রথমতঃ জড়কেন্দ্রিক দর্শনগুলোর বিরোধিতা করতে হবে যা ইতোমধ্যে ধ্বংসের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই জড়কেন্দ্রিক দর্শনগুলি একবার যদি পরাভূত হয়, রিলিজিয়াস ডগ্‌মার শক্তিও স্বাভাবিক ভাবে হ্রাস পেতে থাকবে ও পরিশেষে তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এই ভাবে ধাপে ধাপে এগোতে হবে।

কম্যুনিজমের আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর আর একটি কারণ হ’ল মানুষের মধ্যে মানসিক স্তরে চেতনার বিকাশ। হঠাৎ করে এই যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে, তা হয়েছে প্রাউট, নব্যমানবতাবাদ ও আধ্যাত্মিক দর্শনের জন্যে। মানুষের মৃত্যুকালে অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলির যে আক্ষেপ দেখা দেয় কম্যুনিজমের ক্ষেত্রে ঠিক তাই-ই হচ্ছে। এজন্যেই আবার বলি তোমাদের এই শূন্যস্থান পূরণ করতে হবে।

মানব জীবনে সামাজিক-অর্থনৈতিক দিকটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটাই সব কিছু নয়। যারা মানবতার সেবায় নিবেদিত ও ঈশ্বরকেন্দ্রিক দর্শনে প্রতিষ্ঠিত তাদের ভালভাবে প্রাউট দর্শনের জ্ঞান অর্জন করতে হবে। সামাজিক-অর্থনৈতিক দিক ছাড়াও জীবনের অন্যান্য দিকও রয়েছে। ভাতির (অর্থাৎ বিকাশ ) অন্যান্য ‘অর’ (Spoke) অর্থাৎ অঙ্গগুলিও রয়েছে। প্রাউটের মাধ্যমে ও নিঃস্বার্থ সেবার মাধ্যমে আমরা উপযুক্ত ভাবে মানুষের সেবা করতে পারি যাতে করে তারা জীবনের স্বাভাবিক ধারা বেয়ে এগোতে পারে। তবে আধ্যাত্মিক দর্শনের স্থান জীবনের স্বাভাবিক ধারার ঊর্ধ্বে। আধ্যাত্মিক দর্শন হ’ল সমস্ত কিছুর চক্রনাভি। আধ্যাত্মিকতার প্রচার, প্রাউটের বাস্তবায়ন ও নিপীড়িত মানবতার নিঃস্বার্থ সেবার মাধ্যমে তোমরা স্বল্পকালের মধ্যে জনজীবনের যথাযথ উন্নতি ঘটাতে পারবে।

আমি ইতোপূর্বেই বলেছি, অত্যন্ত নিকট ভবিষ্যতেই ডগ্‌মাকেন্দ্রিক, জড়কেন্দ্রিক ও আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক তত্ত্বগুলিকে ঈশ্বরকেন্দ্রিক  দর্শনের দ্বারা অপসারিত করতে হবে। তাই রিলিজিয়নের ডগ্‌মাকেন্দ্রিক তত্ত্বসমূহ, কম্যুনিজমের জড়কেন্দ্রিক তত্ত্ব ও পুঁজিবাদের আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক তত্ত্বের এই শূন্যতাকে পূরণ করবার জন্যে তোমাদের শারীরিক ভাবে, বৌদ্ধিক ভাবে, নৈতিক ভাবে, বোধিগত ভাবে ও আধ্যাত্মিক ভাবে প্রস্তুত হতে হবে। সময় তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে না। আমাদের কখন সুবিধা হবে, কখন আমরা সমর্থ হব, তার জন্যে তো সময় অপেক্ষা করে থাকবে না। এইটাই সবচেয়ে উপযুক্ত মুহুর্ত্ত। পাঁজিপুঁথি দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। আগামীকালের জন্য প্রতীক্ষা করে বসে থাকবে না।

 (১৫ জানুয়ারী ১৯৯০, কলিকাতা)